চিত্র ১: ঘটনাস্থল মুম্বই। রোগী অবশ্যই কোভিড আক্রান্ত। বাড়ির ঠিকানা, নবি মুম্বইয়ের কোনও এক জায়গা। বয়স, তা হবে মধ্য ৬০। সরকারি কোভিড হাসপাতালে একটা বেড জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছে ওই রোগীর পরিবার। শেষ পর্যন্ত বেড যে মিলেছে, তা-ও নয়। বলতে একটু ভুল হল। বেড অবশ্যই মিলেছে। তবে, কোনও সরকারি হাসপাতালে নয়। বেসরকারি এক হাসপাতালে। ততক্ষণে গোটা দিন খরচ করে, রাস্তায় রাত কাটিয়ে, পরদিন ভোর হয়েছে। স্বজনেরা ঘুরেছেন চরকির মতো। এক হাসপাতাল থেকে আর এক হাসপাতাল। অপেক্ষার পর অপেক্ষা। কর্তৃপক্ষ যেন দায়িত্ব ঝেরে ফেলতে পারলেই বাঁচে। হাসপাতালে ভর্তির দায় তাদের নেই। যদিও, রোগী শেষ পর্যন্ত আর বাঁচেনি। কেন বাঁচেনি, সে-ও এক প্রশ্ন। বেসরকারি হাসপাতালে রেখে চিকিত্সার ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা পরিবারটির ছিল না। দামী একটা ইঞ্জেকশন, কিনে দিতে পারেনি। অগত্যা যা হওয়ার ছিল, তাই হয়েছে। ভর্তির পাঁচ দিনের মাথায় ৬৪ বছরের মানুষটি করোনার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। চিত্র ২: উনিও মধ্য ষাট। ঠিকানা শহর বেঙ্গালুরু। আরও ভেঙে বললে, দক্ষিণ বেঙ্গালুরুর হনুমন্থ নগর। বিনা চিকিত্সায়, বেঙ্গালুরুর ওই রাস্তায়, অসহায়ের মতো মৃত্যু হল বছর পঁয়ষট্টির ওই ব্যক্তির। বলাইবাহুল, উনিও ছিলেন করোনা আক্রান্ত। এই নয় যে বৃদ্ধের মাথাগোঁজার আশ্রয় ছিল না। ঘরবাড়ি ছিল অবশ্যই। কিন্তু, হাসপাতালে যাবেন বলে, অ্যাম্বুল্যান্সর অপেক্ষায় রাস্তাতেই কাটাতে হয়েছে অনেকটা সময়। সে ধকল নিতে পারেনি অসুস্থ শরীর। রাস্তাতেই ছটফট করতে করতে মারা যান। একেবারে চালচুলোহীন জীবনের মতো। চোখের সামনে নির্বাক মৃত্যু দেখা ছাড়া পরিবারের আর কিছু করার ছিল না। হ্যাঁ, আর একটা কাজ তাদের করতে হয়েছে। অনন্ত অপেক্ষা-- । অ্যাম্বুল্যান্সের পথ চেয়ে। তীর্থের কাকের মতো! বেঙ্গালুরুর মতো শহরে বিপন্ন মানুষ একটা অ্যাম্বুল্যান্স পাবেন না? তা হলই বা তিনি করোনা রোগী! চার পাশে কত মানুষই তো এই সংক্রামক অসুখের শিকার। কী বলছেন, বৃহত্ বেঙ্গালুরু মহানগর পালিকে (BBMP)-র আধিকারিকেরা? অ্যাম্বুল্যান্স তো গিয়েছিলই। উনিই বলেছিলেন, বাড়ি থেকে দূরে অ্যাম্বল্যান্স দাঁড় করাতে। সংক্রামক অসুখ নিয়ে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান না। তাই। কিন্তু, অ্যাম্বুল্যান্স পর্যন্ত হেঁটে আসার আগে, অসুস্থ শরীরে রাস্তাতেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন। প্রতিবেশীরা কিন্তু সে কথা বলছেন না। পড়শিদের কথা সত্যি ধরে নিলে, ডাহা মিথ্যে বলছেন BBMP-র আধিকারিকেরা। BBMP-র অ্যাম্বুল্যান্স এসেছিল ঠিকই। সেটা সন্ধে ৭টায়। তার অনেক অনেক আগে, দিনের আলো থাকতেই তিনি মারা গিয়েছেন। পড়শিদের কথায়, কোভিড আক্রান্ত মধ্যষাটের ওই মানুষটিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে সকাল থেকেই ছটফট করছিল পরিবার। একটা অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য নানা জায়গায় তাঁরা ফোন করেছেন। কোথাও ফোন বেজে গিয়েছে। উলটো দিকে ফোন তোলার কেউ ছিল না। আবার ফোন তুললেও অপারগতা জানিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে অজুহাতে। এ ভাবে সকালের অনেকটা সময় কেটে যায়। অ্যাম্বুল্যান্সের আশা ছেড়ে অটোর ভরসায় রোগীকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন স্বজনেরা। গলিপথ ভেঙে বড় রাস্তা। সেখানেই মিলতে পারে অটো। রোগী বড় রাস্তা পর্যন্ত এসেছিলেন ঠিকই। কিন্তু, সেই ধকল নিতে পারেনি অসুস্থ শরীর। অটো এসে পৌঁছনোর আগে রাস্তাতেই সব শেষ! আর নবি মুম্বইয়ের সেই রোগী? তাঁর পরিবার জানাচ্ছে, সারাদিন ধরে অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর, দিনশেষে আমরা যখন রোগীকে ভর্তি করতে পারলাম, ৩২ হাজার টাকা জমা করতে বলা হল। এটা শুধু একটা ইঞ্জেকশনের খরচ। ৬৪-র ওই ব্যক্তি একটা সময় মিউজিক ব্যান্ডে ছিলেন। ছেলে বাবাকে অনুসরণ করে সেই মিউজিক ব্যান্ডে। একলপ্তে ৩২ হাজার টাকা বের করার ক্ষমতা নেই। নেই বলেই, সরকারি হাসপাতালের মুখাপেক্ষী হয়েছিলেন। এই ঘটনা ২০ জুন রাতের। ২৫ জুন ওই বেসরকারি হাসপাতালেই তিনি মারা যান। মৃতের ছেলে জানান, সর্দি-কাশি শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল বাবার। বশিতে নবি মুম্বই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কোভিড হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে বেড নেই। অক্সিজেনের ব্যবস্থা নেই। আমাদের বলা হল, অন্যত্র নিয়ে যেতে। ওদেরই জিগ্যেস করেছিলেন কোথায় নিয়ে গেলে ভালো হবে। জবাব এসেছিল, বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। এর পর, অ্যাম্বুল্যান্সের মধ্যেই অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে, শুরু হয় চরকি ঘোরা। একাধিক হাসপাতাল ফিরিয়ে দেয়। এক-একটার এক-একরকম অজুহাত। একটা দিন এ ভাবে রাস্তায় কাটিয়ে, পরদিন সকালে কোপার খাইরানে এলাকার এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা হয়। ছেলে জানালেন, ২ হাজার টাকার ইঞ্জেকশন নিজেরা কিনতে পারব না বলে, NMMC-কে ফোন করে চেয়েছিলাম। ওরা বলে দেয়, দেওয়া সম্ভব নয়। এই হাসপাতাল নিয়েও পরিবারটির একগুচ্ছ অভিযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বেশকিছু পিপিই কিট কিনে দিলে, শেষকৃত্যের জন্য মৃতদেহ ছাড়তে রাজি হয়।
from Bangla News: বেঙ্গলি খবর, Latest News in Bengali, Breaking News In Bengali, সর্বশেষ সংবাদ | Eisamay https://ift.tt/3gsH1cW



