প্রতিকূল আবহাওয়ায় অক্সিজেন পাবে মাওবাদীরা

পার্থসারথি সেনগুপ্তছত্তিসগড় ছাড়া দেশের অন্যান্য অংশে তাদের প্রভাব এখন অনেকটাই স্তিমিত। পশ্চিমবঙ্গে তাদের কার্যকলাপ তো নেই-ই, গতিবিধিও তলানিতে এসে ঠেকেছে। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে জলবায়ুতে যে সব পরিবর্তনের ঝটকা দেখা যাচ্ছে, তার আর্থ-সামাজিক প্রভাবের জেরে অদূর ভবিষ্যতে ভারতে মাওবাদী আন্দোলনের পালে নতুন করে হাওয়া লাগতে পারে বলে দাবি করছে নিরাপত্তা ও নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে গবেষণার জন্য খ্যাতিসম্পন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপরি)। তাদের ব্যাখ্যাটা এই রকম: আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে দরিদ্র মানুষের পক্ষে জীবনধারণ কঠিন থেকে কঠিনতর হবে, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বিরোধ তীব্র আকার নেবে এবং এই পরিস্থিতির সুযোগ নেবে মাওবাদীরা। পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক অতীতে মাওবাদী আন্দোলন যে সব জায়গায় শুরু হয়েছিল, সেখানকার আবহাওয়া চাষবাসের পক্ষে অনুকূল নয়। অথচ পশ্চিমবঙ্গ একটি কৃষিপ্রধান রাজ্য। আবার পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম জেলায় তেমন শিল্পও গড়ে ওঠেনি। মাওবাদীদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যখন সামিল হয়েছিলেন, তখন তাঁদের জীবিকা নির্বাহের জন্য কঠিন জীবনযুদ্ধ করতে হত। লালগড় আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সেই সময়ে, ২০১০ সালে জঙ্গলমহল তথা রাঢ়বঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশে খরা হয়।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার গত সাত বছর ধরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলর কর্মসূচি নিয়েছে এবং তার মধ্যে কয়েকটি শুধু জঙ্গলমহলের কথা মাথায় রেখে। এতে ওই তল্লাটের হতদরিদ্র মানুষদের একটা বড় অংশের ক্ষোভের প্রশমন হয়েছে বলে বিরোধীদের অনেকেও স্বীকার করেন।তবে সিপরির রিপোর্টে ঠারেঠোরে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের জীবন ও জীবিকার সংস্থানের উপর আঘাত হানছে। ফলে, আর্থ সামাজিক সমস্যার মোকাবিলায় উগ্র বাম রাজনৈতিক মত ও পথ আগামী দিনে বহু মানুষের কাছে আকর্ষক ঠেকতে পারে। সিপরির সদর দপ্তর স্টকহোমে। সংস্থাটি ‘দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন ও হিংসার প্রকোপ’ শীর্ষক রিপোর্টে ভারত জুড়েই অতি বাম রাজনীতির প্রতি ঝোঁকের ভবিষ্যদ্বাণী করেছে।সিপরির রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘ভারতের মতো দেশে হালে দারিদ্র দূরীকরণের কাজ চলেছে। কিন্তু তার গতি মন্থর ও অসম। তার উপর বন্যা, খরা, সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপও বাড়ছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষই গ্রামে বাস করেন। ফলে জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তন গ্রামীণ মানুষের জীবনজীবিকার উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে।কৃষক বা মৎস্যজীবীরা এক্ষেত্রে মূল ভুক্তভোগী।’ বাংলায় সাতের দশকে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত সন্তোষ রাণার কথায়, ‘আমার জন্ম যেখানে, সেই এলাকায় সুবর্ণরেখা নদীতে এখন তেমন মাছ মিলছে না। নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের প্রায় ৩০ শতাংশই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁদের জীবনজীবিকা এই মুহূর্তে বিপন্ন। নদীতে বিষ ঢাললে আর মাছ বাঁচবে কী করে! অগুণতি মানুষ যদি এর শিকার হন, তাঁদের জীবিকার সংস্থান যদি হারিয়ে যায়, তা হলে তো রাজনৈতিক ভাবে প্রতিবাদ ধূমায়িত হতে বাধ্য।’ সাতের দশকে নকশাল আন্দোলনের আর এক অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব অসীম চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘প্রান্তিক মানুষ ক্রমাগত শোষিত হতে হতে একটা সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা হয়। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনও যদি দারিদ্র ও অভাব বাড়িয়ে তোলে, সেটা আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করবে।’ সমাজবিদ প্রশান্ত রায় বলেন, ‘নোবেলজয়ী এক অর্থনীতিবিদও তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, অর্থনীতির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলি এখনও পর্যন্ত রাজনীতির ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন তথা পরিবেশগত ভারসাম্যের সমস্যার কথা তুলে ধরেনি। তবে এটা ঘটনা, হালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘জল ধরো জল ভরো’র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া জলাভূমি ফিরিয়ে আনার কাজটা করছে।’

from Eisamay https://ift.tt/2Puf7U9

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.