সুদিন ফিরবেই, আশায় ছিটমহল

অনির্বাণ ঘোষ ও প্রবীর কুন্ডু ■ দিনহাটাপ্রতি মাসে পরিবার পিছু ৩০ কিলো চাল দেয় সরকার। ‘কী ভাবে এ দিয়ে সংসারের আট জনের মুখে অন্ন জোটাব?’-প্রশ্ন একাদশী অধিকারীর। পৈতৃক সাত কাঠা জমির উপর সরকার উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র বানিয়ে দিয়েছে তাঁদেরই জন্য। ‘কিন্তু ওই জমির দাম এখনও দেয়নি সরকার। দাম কি মেটাবে না?’-প্রশ্ন আবুল শেখের। সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়ে দিব্যি পড়াশোনা করছে ছেলেমেয়েরা। তাদের বাবা লুফতর প্রামাণিকের অবশ্য প্রশ্ন, ‘জন্মের প্রমাণপত্র কবে পাবে ছেলেমেয়েগুলো?’এমনই একগুচ্ছ প্রশ্ন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ চেয়ে বসে আছেন ওঁরা। কারণ, নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সমস্যা থেকে গেলেও, একদা সাবেক ছিটমহলবাসীর জন্য মুখ্যমন্ত্রী করেছেন অনেক। কেউ ছিলেন বাংলাদেশের ভারতীয় ছিটমহলে, কেউ বা ভারতের বাংলাদেশি ছিটমহলে। ২০১৫-র জুলাই থেকে তাঁরা সকলেই এ দেশের ভূমিতে সরকারি ভাবে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক। কিন্তু স্বীকৃতি মিললেও তিন বছর পরও একরাশ অপ্রাপ্তি এখনও নিত্যসঙ্গী তাঁদের। মুক্তির উপায় খুঁজতেই ওঁরা মুখ্যমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী। আজ, সোমবার দু’দিনের সফরে কোচবিহার পৌঁছচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথম দিনেই রয়েছে প্রশাসনিক বৈঠক। তার ২৪ ঘণ্টা আগে, রবিবার দিনহাটার কৃষি খামারের মাঠ লাগোয়া শিবির, মশালডাঙ্গার সাবেক ছিটমহল গ্রামে ঘুরলেই মালুম হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি মানুষের প্রত্যাশা। কোচবিহারের দিনহাটা, মেখলিগঞ্জ আর হলদিবাড়ির তিনটি অস্থায়ী শিবির গত তিন বছর যাবৎ ২৩০টি পরিবারের ৯৮০ জন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই। বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল-বিনিময় চুক্তির আগে এঁরা থাকতেন যথাক্রমে বাংলাদেশের ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ার ছরা, লালমনিরহাট ও রংপুরে। দেশের টানে এঁরা ফিরেছেন ভারতের মাটিতে। মিলেছে নাগরিকের স্বীকৃতি, ভোটার কার্ড, আধার। কিন্তু হারিয়েছেন জমি আর জীবিকা। ছিটমহল ইউনাইটেড কাউন্সিলের সম্পাদক, অধুনা দিনহাটার কৃষি খামারের মাঠ লাগোয়া অস্থায়ী শিবিরের বাসিন্দা মিজানুর রহমানের আর্জি, ‘আমরা বাংলাদেশের পুরোনো জমি কি ফেরত পাব না? দয়া করে আমাদের দিকে একটু নজর দিন, দিদি। প্রয়োজনে সরকারি ঋণটুকু যেন পাই।’ তাঁর মতোই অনুনয়ের সুর কৃষ্ণ অধিকারী, খলিলুর রহমান, ফণীকান্ত বর্মন, মুজাম্মেল খন্দকারদের গলায়। ভারতের মাটিতে কোচবিহারের মশালডাঙ্গা, পোয়াতুরকুঠি, করলা, বাকালির ছরা, নলগ্রাম, মেখলিগঞ্জ, শীতলখুচি, সিতাইয়ে ছিল সাবেক বাংলাদেশি ছিটমহল। সেখানকার প্রায় ১৬ হাজার বাসিন্দার কেউই অবশ্য বিনিময় চুক্তির পর আর ওপার বাংলায় ফেরেননি। গোটা রাজ্যে যে উন্নয়নের গতি, তার রেশ ষোলো আনা পড়েনি এই গ্রামগুলোয়। জমির কাগজ না মেলায় মিলছে না কৃষিকাজ সংক্রান্ত কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধা। মশালডাঙ্গার পরিমল রায়, সুরজ আলি, জয়নাল মণ্ডলরা রবিবার বলেন, ‘সবাই রেশন কার্ড পাইনি। জমির কাগজ আর ছেলেমেয়েগুলোর বার্থ সার্টিফিকেট খুব দরকার। দেখুন না দিদি, যদি এগুলোর কোনো সুরাহা হয়।’উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ অবশ্য আশাবাদী, এর অনেকগুলি বিষয়ই উঠবে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে। তাঁর কথায়, ‘ওঁদের বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কোচবিহারের অন্যতম অগ্রাধিকার। পূর্ত, কৃষি, সেচ, শিক্ষা-সহ বিভিন্ন দপ্তর ওঁদের উন্নয়ন প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করছে।’

from Eisamay https://ift.tt/2OacOAV

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.